গ্রীষ্মের দুপুর / গ্রীষ্মের একটি নির্জন দুপুর / নির্জন দুপুরের অভিজ্ঞতা - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

0
491
ভূমিকা : 
‘জলশূন্য পল্লীপথে ধূলি উড়ে যায় 
মধ্যাহ্ন বাতাসে; স্নিগ্ধ অশথের ছায় 
ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিকারিনী জীর্ণ বস্ত্র পাতি 
ঝাঁ ঝাঁ করে চারিদিকে নিস্তব্ধ নিঝুম।’ 
 
গ্রীষ্মের আগমনে বাংলার প্রকৃতি রুক্ষ, বিবর্ণ ও বিশুষ্ক হয়ে ওঠে। গ্রীষ্ম যখন আপন ভাবমূর্তি নিয়ে প্রকৃতিতে ধরা দেয়, তখন বাংলার প্রকৃতি হারাতে বসে বসন্তের পত্র-পল্লবের সমারোহ, অশোক, পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার লাল আগুন নিভে যায়। কোকিলের ডাক শোনা যায় না। ভ্রমরের গুঞ্জরণ, প্রজাপতির ব্যস্ততা সব যেন হারিয়ে যায় কোথায়। হারিয়ে যায় অপরূপ শ্যামল প্রকৃতির সবুজ শোভা। আর এই রূক্ষতা ও বিবর্ণতার যথার্থ বিমূর্ত রূপ ফুটে ওঠে গ্রীষ্মের দুপুরে। এ এক অনন্য রূপ। গ্রীষ্ম ছাড়া অন্য কোনো ঋতুতে ঠিক দুপুরে সেই ঋতুর চরিত্র এমন সুন্দরভাবে ধরা দেয় না। 
 
গ্রীষ্মের রূপ : বঙ্গ-প্রকৃতির ঋতুরঙ্গশালায় প্রথম ঋতু-নায়ক গ্রীষ্ম। বর্ষচক্রের প্রথম দৃশ্যেই ক্রুদ্ধ দু’চোখে প্রখর বহ্নিজ্বালা নিয়ে আবির্ভাব ঘটে এই মহাতাপসের। নির্দয় নিদাঘ-সূর্য কঠিন হাতে ছুঁড়ে মারে তার নিদারুণ খরতপ্ত অগ্নিবাণ। প্রখর তাপদাহে জীবধাত্রী ধরিত্রীর বক্ষ বিদীর্ণ হয়ে যায়, চৌচির হয়ে যায় তার তৃষ্ণার্ত প্রান্তর। তাই কবি বলেছেন, 
‘ঘাম ঝরে দরদর গ্রীষ্মের দুপুরে 
মাঠ-ঘাট চৌচির, জল নেই পুকুরে।’ 
 
গ্রীষ্মের মরু-রসনায় ধরিত্রীর প্রাণ-রস শোষিত হয়ে কম্পিত শিখা উঠতে থাকে মহাশূন্যে। এই দারুণ দহন-বেলা স্তব্ধ হয়ে যায় সকল পাখ্-পাখালির। সর্বত্রই এক ধূসর মরুভূমির ধূ-ধূ বিস্তার। সমগ্র জীবজগতে নেমে আসে এক প্রাণহীন, রসহীন, পাণ্ডুর বিবর্ণতা। তারই মধ্যে একদিন কালবৈশাখীর আগমন ঘটে। গ্রীষ্ম ফুলের ঋতু নয়, ফুল ফোটাবার তাড়া নেই তার; শুধু ফলের ডালা সাজিয়েই সে নিঃশব্দে বিদায় নেয়। 
 
বিশেষ একটি দুপুর বা গ্রীষ্মের দুপুরের অভিজ্ঞতা : কোনো কোনো নিঃসঙ্গ দুপুর এক সাগরের একাকিত্ব নিয়ে কারো কারো হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। তেমনি এক দুপুরের অভিজ্ঞতার কথা আজ দীর্ঘদিন পরে আমার হৃদয়ের মণিকোঠায় ভেসে উঠছে। সময়টা জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি। গ্রীষ্মের এক তপ্ত দীর্ঘ দুপুরকে খুব কাছ থেকে পেলাম। কর্মব্যস্ত সকল এক সময় ঝিমিয়ে এলো। আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। সেই আগুনে পুড়ছে গাছপালা, পশুপাখি, মানুষজন। বাতাসে আগুনের ছোঁয়া। রাস্তায় কোনো লোকজন নেই। আমি গ্রাম-বাংলার মাটির কুঠিতে একা। এক কুঠি-বাড়ির চারপাশে আম, কাঁঠাল, তেঁতুল, জাম, হিজল, পেয়ারা, নারিকেল গাছের সমারোহ। মাঝে মাঝে তপ্ত হাওয়ার ছোটছুটি। পাতায় পাতায় শিহরণ-ধ্বন। তপ্ত হাওয়া মাটিতে লুটিয়ে থাকা শুকনো পাতার দলকে উড়িয়ে নিয়ে যায় কোন সুদূরে। শুকনো পাতার ‘মরমর’ আওয়াজ দুপুরের নিস্তব্ধতাকে আরও বেদনাবিধুর করে তোলে। এই নির্জন দুপুর ধীরে ধীরে আমাকে আচ্ছন্ন করল। জানালার পাশে মুখ রাখতেই চোখ পড়ল পুকুরের ধারে রৌদ্রতপ্ত দাঁড়কাক পানিতে পাখা মেলে পড়ে আছে, মনে হয় যেন মরে পড়ে আছে। এরকম দৃশ্য চোখে ভেসে উঠল রবী ঠাকুরের ‘মধ্যাহ্ন’ কবিতার কয়েকটি চরণ- 
বেলা দ্বিপ্রহর। 
ক্ষুদ্র শীর্ণ নদীখানি শৈবালে জর্জর 
স্থির স্রোতহীন। অর্ধমগ্ন তরী ‘পরে 
মাছরাঙা বসি, তীরে দুটি গরু চরে 
শস্যহীন মাঠে। শান্তনেত্রে মুখ তুলে 
মহিষ রয়েছে জলে ডুবি। নদীকূলে 
জনহীন নৌকা বাঁধা। শূন্যঘাট-তলে 
রৌদ্রতপ্ত দাঁড়কাক স্নান করে জলে 
পাখা ঝট্পটি। 
 
এ নির্জনতারও এক জাদু আছে! আমার সামনে রূপকথার সেই ঘুমন্ত নির্জন রাজপুরীর ছবি ভেসে ওঠে। আমি তখন এক নির্জন তেপান্তরের মাঠের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছি। এই নির্জন দুপুর ধীরে ধীরে আমাকে আচ্ছন্ন করছিল। হঠাৎ ভিখারির হাঁক আমার কানে যেন আরও গভীর কথা বলে গেল। জীবন হয়তো এরকমই লড়তে লড়তে বাঁচা। বা বাঁচতে গিয়ে লড়াই। আমার চোখে ঘুম নেই। পড়ার তাড়াও নেই। নেই কোথাও যাওয়ার উৎসাহ। এই নির্জনতা আমাকে ঘুমাতে দেয় না। কত কী মনে পড়ে। গা ছমছম করে। আগুন-ঝরা এই নির্জন দুপুর আমাকে যেন কোথায় নিয়ে চলছে। আমি চেয়ে আছি। কিন্তু কিছুই দেখছি না। কেমন এক নির্জনতার গায়ে গায়ে মাখা। শব্দ-কোলাহলময় পৃথিবী যেন আমার কাছে চিরকালের মতন স্তব্ধ হয়ে গেছে। ভেতর মহলের কপাট খুলে যাচ্ছে একটার পর একটা। এই নীল নির্জন দুপুরে আমি রূপকথার অন্দরমহলে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। কক্ষে কক্ষে থরে থরে সাজানো কত হাসি কান্না, কত দীর্ঘশ্বাস। আমাকে পেয়ে কথারা জেগে ওঠে। জেগে ওঠে বেঙ্গমা-বেঙ্গমী, ঘুমন্তপুরীর রাজকন্যে, রাক্ষস-খোক্ষসের দল। 
 
এমনি তন্দ্রাচ্ছন্নের মধ্যে কতক্ষণ কাটালাম জানি না। কুকুরের চিৎকারে একসময় ঘোর কাটল। রোধের রঙ বদলাতে শুরু করেছে। নির্জন দুপুরে আবার সরব হতে চায়। অনুভব করি নির্জনতা কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়। নির্জন দুপুর দিনরাত্রিরই এক অখণ্ড রূপ। কোলাহল ব্যস্ততারই এক ভিন্ন চেহারা। নির্জন দুপুর আজ আমার কাছে এক পূর্ণতার রূপ নিয়েই হাজির। এক অখণ্ড সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি হিসেবেই উদ্ভাসিত। এই স্তব্ধ, শান্ত দুপুর আমাকে মনে করিয়ে দেয় ধরিত্রীর সঙ্গে আমার জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্কের কথা। তখন আরও কত কি ছায়াছবির মতন ভেসে চলে মনের ওপর দিয়ে। এক মহৎ উপলব্ধি ভাস্মর হয়ে ওঠে নিসর্গলোকের এই খণ্ডমুহূর্তটি। এই প্রথম আমার সামনে উদ্ঘাটিত হয় নির্জন দুপুরের সত্য স্বরূপটি। 
 
গ্রীষ্মের দুপুরের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য : নিঝ্ঝুম দুপুরের তন্দ্রা ভেঙে দেয় ভয়াল কালবৈশাখী। যদিও বিকেলের দিকেই সাধারণত কালবৈশাখী হয়। তবে মাঝে মাঝে দুপুরেও আকাশ কালো করে কালবৈশাখীর তাণ্ডব শুরু হয়। তছনছ করে দিয়ে যায় সবকিছু। 
 
শহরে গ্রীষ্মের দুপুর : শহরে গ্রীষ্মের দুপুরের নির্জনতার অবকাশ নেই। কর্মকোলাহলময় শহরের যান্ত্রিক বাস্তবতায় গ্রীষ্মের দুপুর একরকম উপেক্ষিত হয় বলা চলে। যারা বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে তাদের কাছে গ্রীষ্মের দুপুরের কোনো অস্তিত্ব নেই। কেননা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আভিজাত্য তাদের গ্রীষ্মের প্রখরতা অনুভব করার সুযোগ দেয় না। তবে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশার অন্ত থাকে না। জীবনের তাগিদে তাদের বাধ্য হয়েই কাজে নামতে হয়। ঠেলাওয়ালা, রিকশাওয়ালাদের কষ্টের সীমা থাকে না। শহরে তো গাছের ছায়ায় দু’দণ্ড জিরিয়ে নেয়ার উপায় নেই। গ্রীষ্মকালে পানির ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎসংকট দেখা দেয়। সে কারণে শিল্প-এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎপ্রবাহ সচল রাখতে আবাসিক এলাকায় প্রায়ই বিদ্যুতের লোডশেডিং হয়। প্রচণ্ড গরমে মধ্য-দুপুরে এই লোডশেডিং যেন অভিশাপ হয়ে আসে। 
 
উপসংহার : ঋতুরঙ্গময়ী রূপসী বাংলা। বঙ্গ-প্রকৃতির ঋতুরঙ্গ শাখার তার কী ছন্দোময়, সংগীতময় অনুপম-রূপ বিস্তার! ঋতু পরিবর্তনের বর্ণ-বিচিত্র ধারাপথে নিয়ত উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে তার অন্তহীন রূপের খেলা, রঙের খেলা, সুরের খেলা। অনুপম বৈচিত্র্যময় ঋতুরঙ্গের এমন উজ্জ্বল প্রকাশ বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোথাও দেখা যায় না। তাই রূপমুদ্ধ, বিষয়-পুলকিত কবি তাঁর আবেগ-স্নিগ্ধ উচ্চারণে বাংলাকে বলেছেন-’রূপসী বাংল’। প্রতিটি ঋতু এখানে আসে তার বৈচিত্র্য-বিলাসিত স্বাতন্ত্র্যের অনুপম রূপসজ্জায়। রূপের ঐশ্বর্যে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলার পথ-প্রান্তর। এরপর বেজে ওঠে তার অশ্রুবিধুর বিদায়ের করুণ রাগিনী; সে তার রূপ বিস্তারে অন্তিম স্মৃতিচিহ্নটুকু নিঃশেষে মুছে নিয়ে চলে যায় কালের অনন্ত যাত্রাপথে। এক ঋতু যায়, আসে অন্য ঋতু। ভিন্ন ভিন্ন ঋতুর রূপ বৈচিত্র্যে বাংলাদেশ যেন সৌন্দর্যময়ী তেমনি আকর্ষণীয়। এ জন্যই কবি বলেছেন, 
 
‘এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ তবু রঙ্গে ভরা।’
Suche
Kategorien
Mehr lesen
Health tips
Avoid these mistakes to stay healthy in excessive heat
Our country is experiencing hot weather most of the time. The humidity of the air has also...
Von Health Tips 2025-07-04 05:11:35 0 1KB
Islamic
Arabic Quran AL Majeed Hafizi 15 lines Para - 13
Arabic Quran AL Majeed Hafizi 15 lines Para - 13      
Von শিক্ষা গুরু 2025-07-16 08:29:43 0 597
Home Tips
4 ways to remove old stains from white clothes!
You've always washed and cleaned your clothes and found that they have yellow stains from sweat...
Von Tips and tricks 2025-07-06 05:29:56 0 1KB
Paragraph and composition
কর্তব্যনিষ্ঠা / কর্তব্যপরায়ণতা বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : প্রত্যেক মানুষকেই নিজ নিজ ভূমিকা রাখতে হয়। সম্পাদন করতে হয় আপন আপন করণীয়। এক্ষেত্রে...
Von শিক্ষা গুরু 2025-07-15 04:56:14 0 471
Paragraph and composition
বয়স্কাউট / বালকসেনা বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : এ পৃথিবী আসলে একটি সংগ্রামক্ষেত্র। এখানে টিকে থাকতে হলে প্রতিনিয়ত সংগ্রামের...
Von শিক্ষা গুরু 2025-07-15 12:12:21 0 429
Otvut https://new.socitime.com/