আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

0
477
ভূমিকা : আটই সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। জাতিসংঘের আহ্বানে প্রতি বছর সারা বিশ্ব জুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটি উদযাপন করা হয়। তবে উন্নত বিশ্বের জন্য তা তেমন তাৎপর্যপূর্ণ বিবেচিত না হলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য তা বিশেষভাবে গরুত্বপূর্ণ। বিশেষত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষেত্রে নিরক্ষরতার যে পরিস্থিতি বর্তমানে বিদ্যমান তার প্রেক্ষিতে এসব দেশে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের উপযোগিতা অনেক বেশি। সারা বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ লোক নিরক্ষর। সারা বিশ্বের এই নিরক্ষর এক শ কোটি লোকের মধ্যে প্রায় ৬৭ কোটি নিরক্ষর লোক বাস করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে।
 
বাংলাদেশে সাক্ষরতা পরিস্থিতি : বাংলাদেশ এই নিরক্ষরবহুল অঞ্চলে অবস্থিত এবং দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ লোক নিরক্ষর বলে অনুমিত হয়। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী শিশুদের সামনে এখনও বিদ্যালয়ের দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন কার্যকর করায় এসব শিশু শিক্ষার আলোয় এসে আমাদের দেশে সাক্ষরতার হার দ্রুত বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে তাতে সন্দেহ নেই। এই প্রত্যাশিত সাফল্য আমাদের কাছে পৌঁছানোর আগে বয়স্ক সাক্ষরতার বিষয় বিবেচনা করা আবশ্যক। আমাদের দেশে এখন বয়স্ক সাক্ষরতার হার শতকরা প্রায় পঞ্চাশ। এগার বছরের ওপরে বয়স এমন লোকসংখ্যার শতকরা পঞ্চাশ ভাগেরও বেশি লোক নিজেদের জীবনে নিরক্ষরতাকে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বলে মেনে নিয়েছে। শিক্ষার আলো তারা চারদিকে দেখছে। কিন্তু তাতে তারা নিজেদের জীবন আলোকিত করতে পারছে না। আধুনিক শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ওপর চলমান বিশ্বের আয়োজনে তাদের অংশ নেই। দেশে যা কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে লেখাপড়ার বাহন না পাওয়ার জন্য তা নিরক্ষর মানুষকে এখন কিছু দিতে পারছে না। উন্নত জীবন যাপনের জন্য যা কিছু আহ্বান তা শিক্ষার অভাবে আমাদের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর কানে পৌঁছতে পারছে না। অথচ প্রায় একই পরিস্থিতিতে বিরাজমান থেকে আমাদের আশেপাশের দেশগুরো সাক্ষরতার হার দ্রুত বাড়িয়েছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে সাক্ষরতার হার যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে আমাদের প্রচেষ্টা সেভাবে ফল লাভ করেনি। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এদেশে সাক্ষরতা বিস্তারের উদ্যোগ চলছিল। কিন্তু তা যথাযথ সমন্বিত না হওয়ায় এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি সাধিত হয়নি।
 
গৃহীত কার্যক্রম : দু হাজার সাল নাগাদ সবার জন্য শিক্ষার শ্লোগান তোলা হয়েছিল। পাঁচ বছরের মাথায় সাক্ষরতার হার শতকরা ৬২ ভাগে উন্নীত করা হবে বলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এর সমর্থনে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করার ফলে গ্রামীণ মেয়েদের শিক্ষা লাভের সুযোগও পরোক্ষভাবে সাক্ষরতার ওপর প্রভাব ফেলবে। তবু বয়স্ক শিক্ষার ওপর আরও গুরুত্ব প্রদান না করা হলে বর্তমানের বিপুল নিরক্ষরের সংখ্যা সমস্যা হিসেবে বিরাজ করবে। তাছাড়া বিদ্যালয়ে না যাওয়া এবং বিদ্যালয়ত্যাগী শিশুরা কালক্রমে নিরক্ষরের হার বৃদ্ধি করবে। সেজন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার আইন কঠোরভাবে কার্যকর করে নতুন নিরক্ষর সৃষ্টির পথ যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি বয়স্ক শিক্ষার আরও সুযোগ সৃষ্টি করে জনগণকে সাক্ষর করে তুলতে হবে। যৌথ উদ্যোগের ওপর জাতর সাক্ষর হয়ে ওঠার নির্ভরশীল। কোন লক্ষমাত্রাই যথাসময়ে অর্জিত হয়নি।
 
দিবসের তাৎপর্য : আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদ্‌যাপনের মাধ্যমে সাক্ষরতার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার সৃষ্টি করা হয় এবং অনুষ্ঠিত সভা সম্মেলনের চিন্তা-ভাবনা থেকে কিছু কিছু নির্দেশনাও লাভ করা যায়- যা সাক্ষরতার সম্প্রসারণে সহায়তা করবে। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের বিশেস তাৎপর্য রয়েছে। নিরক্ষরতা দূরীকরণের উদ্দেশ্যে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যেসব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে তা সবার সমর্থন করা এবং ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা অত্যাবশ্যক বলে বিবেচনার যোগ্য। দেশের সমস্যার ভয়াবহতা বিবেচনা করে তা একযোগে মোকাবিলা করার ব্যবস্থা নিলে ভবিষ্যৎ সাফল্য অনিবার্য হয়ে উঠবে।
 
দেশের অধিকাংশ মানুষ সাক্ষরতার মর্ম সম্পর্কে সচেতন না থাকার ফলে বিভিন্ন প্রচেষ্টা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উদ্‌যাপনের মাধ্যমে এমন কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করা দরকার যার ফলে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যাদের জন্য সাক্ষরতার প্রয়োজন তাদের সংশ্লিষ্ট করতে হবে।
 
সাক্ষরতা ও জীবিকা : তবে সাক্ষরতার ধরন সম্পর্কেও বিবেচনা করা দরকার। সাক্ষরতার সঙ্গে জীবন ও জীবিকার ঘনিষ্ঠ সংযোগ থাকা অত্যাবশ্যক। যে লেখাপড়া থেকে জীবিকার কোন অবলম্বন পাওয়া যাবে না, তার প্রতি নিরক্ষর জনগণের কোন আগ্রহ নেই। সেজন্য এ যুগে সাক্ষরতার সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন শুধু স্বাক্ষর করতে পারলেই সাক্ষর বোঝায় না, এখন সাক্ষরতা বলতে লেখাপড়া ও হিসাব শেখার একটা মান বোঝায় -যা অর্জনের মাধ্যমে জীবিকার উপায় বের করা সম্ভব। তাই এখন সাক্ষরতার পাঠ্যক্রমে জীবনভিত্তিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন মেটানোর জ্ঞান এখনকার সাক্ষরতা থেকে লাভ করতে হবে। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সাক্ষরতা পরিচয় করিয়ে দেবে। জীবনে কিছু কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পথ করে দেবে সাক্ষরতা।
 
উপসংহার : আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের মাধ্যমে সাক্ষরতার যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে এবং সেই সঙ্গে নিরক্ষর জনগণের কাছে সাক্ষরতা অর্থবহ করে সম্প্রসারণের জন্য সকল পর্যায়ের শিক্ষিত লোকদের আন্তরিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু সরকারি কার্যক্রমই যথেষ্ট নয়, সমস্যার ব্যাপকতা ও ভয়াবহতা বিবেচনা করে সকল শিক্ষিত জনসাধারণকে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করতে হবে।
Buscar
Categorías
Read More
Paragraph and composition
মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : জগতে মাতাপিতার তুল্য, হৈতষী, পরম শ্রদ্ধাভাজন গুরু আর কেউ নেই। তাদের ত্যাগ তিতিক্ষার...
By শিক্ষা গুরু 2025-07-16 03:31:46 0 496
Paragraph and composition
পল্লী উন্নয়ন - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
চলো গ্রামে ফিরে যাই / বাংলাদেশের গ্রামীণ উন্নয়ন ভূমিকা : ‘লাগলে মাথায় বৃষ্টি বাতাস...
By শিক্ষা গুরু 2025-07-14 14:47:21 0 481
Kitchen
10 tips for cleaning the kitchen
Keeping your home tidy is a difficult task. The most difficult task is keeping the kitchen clean....
By Leading kitchen 2025-07-06 15:30:26 0 1K
Paragraph and composition
মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বাংলাদেশ - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মুক্তবাজার অর্থনীতি।...
By শিক্ষা গুরু 2025-08-07 06:56:08 0 308
Paragraph and composition
বাংলাদেশের জাতীয় গাছ আম গাছ - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : বাঙালিদের জীবন ও ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো আম গাছ। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক সব...
By শিক্ষা গুরু 2025-08-08 09:30:25 0 352
Otvut https://new.socitime.com/