কুসংস্কার - বাংলা প্রবন্ধ রচনা

0
345
ভূমিকা : মানব জীবনে এমন কিছু সংস্কার বা বিশ্বাস দেখা যায় যার অশুভ প্রভাবে জীবনের বিকাশ রুদ্ধ হয় এবং জাতীয় জীবন নানাভাবে বিপর্যস্ত হয়ে থাকে। কুসংস্কার এমনি একটি ধারণা বা রীতি বা বিশ্বাস। জীবনকে নানা অনাচারে আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা আছে এর এবং এর চরণে নিবেদিত হয়ে মানুষ নিজেকে ব্যক্তিত্বহীন করে তোলে। জাতিকে পেছনে ফেলে রাখার জন্য কুসংস্কারের ভূমিকা কোন অংশে উপেক্ষার নয়।
 
কুসংস্কারের স্বরূপ : কোন বুদ্ধি বিবেচনা ও যুক্তিতর্কের বাইরে মানব মনের এক ধরনের অন্ধ বিশ্বাসকে কুসংস্কার বলা হয়। এমন অনেক ঘটনার ওপর মানুষের বিশ্বাস জন্মায় যার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। সেখানে এক বিমূঢ় অন্ধ বিশ্বাস হৃদয়মন আচ্ছন্ন করে, কোন যুক্তি দাঁড় করিয়েও তাকে অর্থহীন বলে বিশ্বাস করানো যায় না। এই প্রবণতাই কুসংস্কার। এ ধরনের বিশ্বাসকে সত্যাসত্যের মাপকাঠিতে যাচাই করতে মন কখনও সচেতনতা দেখায় না।
 
একটা অন্ধ বিশ্বাস সেখানে প্রাধান্য পায়। মন সেখানে দুর্বলতা প্রদর্শন করে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে যাচাই করার মত মানসিকতাও থাকে না। কুসংস্কার বিজ্ঞানের আলোকে অর্থহীন, কিন্তু দুর্বল হৃদয় তা সঠিকভাবে কাজ করে যায়। কুসংস্কারের সঙ্গে জড়িত হয়ে থাকে হৃদয়ের অন্ধ বিশ্বাস। বিজ্ঞানের নিরিখে তা অর্থহীন, কিন্তু আবেগে তা জাজ্বল্যমান। অন্ধ বিশ্বাসের ফলে কুংস্কারের সৃষ্টি। আবার যুগ যুগ ধরে তা প্রচলিত হয়ে এসেছে বলে এর দৃঢ় ভিত্তি সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। কুসংস্কার বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে রাখে, বিজ্ঞান সেখানে উপেক্ষিত এবং অন্ধ বিশ্বাস সেখানে দৃঢ়মূল। মহানবী (স) বলেছেন, ‘শুভ বা অশুভ লক্ষণ এবং যাবতীয় কুসংস্কারজনিত বিশ্বাস হারাম।’
 
কুসংস্কারের দৃষ্টান্ত : কুসংস্কারের প্রথম সৃষ্টি মানব সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে এবং তার ইতিহাস বর্জন-সংযোজনের ইতিহাস। সেজন্য কুসংস্কারের দৃষ্টান্তের তালিকা বৈচিত্র্যধর্মী ও দীর্ঘাকৃতির হতে পারে। আবার যুগে যুগে তার পরিবর্তন, সংযোজন ও বিয়োজন ঘটেছে। কুসংস্কারের ভিন্নতা ঘটে বয়সের জন্য। আবার নারী-পুরুষের ব্যবধানের প্রেক্ষিতে কুসংস্কারের ভিন্নতা দেখা দেয়। কুসংস্কার ছোট ছোট বিষয়ে যেমন আছে, তেমনি বড় বড় ব্যাপারেও কুসংস্কার লক্ষ করা যায়। এক সময় ইংরেজদের আগমনের পরে ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপারে অনীহা সৃষ্টিকারী এক ধরনের কুসংস্কার সৃষ্টি হয়েছিল।
 
ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বিতৃষ্ণার এ দেশবাসীর জীবনে যে পশ্চাদমুখিতা দেখা দিয়েছিল তা কুসংস্কারেরই ফল। এক সময় নারী শিক্ষার প্রতি সমাজ বিরূপ ছিল এবং এখনও কিছুটা আছে -নারী শিক্ষাকে উদারভাবে গ্রহণ করা যায়নি। ফলে শিক্ষাদীক্ষায় মেয়েরা পিছিয়ে থেকে জাতীয় জীবনে অনগ্রসরতা সৃষ্টি করে কুসংস্কারের নিদর্শন রাখছে। এক সময় হিন্দু সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। কি নির্মম ছিল সে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ! কৌলিন্য প্রথা আর যৌতুকের রাহু গ্রাস এখনও সমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ব্যক্তি জীবনের ক্ষুদ্র পরিসরে কুসংস্কারের অন্ত নেই। ‘আজকের দিনটি কেমন যাবে’ -পত্রিকার এই কলামটিতে চোখ না বুলিয়ে অনেক শিক্ষিত লোক ঘর থেকে বের হন না। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় চৌকাঠে মাথা ঠেকলে, হোঁচট খেলে, শূন্য কলসী দেখলে, হাঁচি পড়লে, টিকটিকি ডাকলে -কেউ কেউ খানিকটা বসে তারপর যাত্রা করেন। এভাবে অসংখ্য কুসংস্কার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে আছে। অনেকে পাথর ব্যবহার করেন।
 
প্রত্যাশিত ফলের চেয়ে বিশ্বাস প্রবণতা সেখানে বেশি। তের সংখ্যা দুর্ভাগ্যের, ঊনপঞ্চাশ সংখ্যা মস্তিষ্কবিকৃতির, চার শ’বিশ সংখ্যা প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে লোকে বিশ্বাস করে। অমাবস্যার রাতে শেওড়া গাছের নিচ দিয়ে যেতে আধুনিক শিক্ষিত লোকও ভীত হয়ে ওঠে ভূতের ভয়ে।
 
 
কুসংস্কারের প্রভাব : কুসংস্কার ব্যাপকভাবে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকল মানুষই কুসংস্কারের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। তবে অশিক্ষিত লোকের মধ্যে কুসংস্কার বেশি। কিন্তু শিক্ষিত লোকের মধ্যে কম হলেও তারা একেবারে কুসংস্কারমুক্ত নয়। এমন কি শিক্ষা সভ্যতায় সমৃদ্ধ জাতিসমূহের মধ্যেও কুসংস্কারের অস্তিত্ব রয়েছে। দেশে দেশে অবশ্য কুসংস্কারের পার্থক্য আছে। কুসংস্কারের প্রভাবে মানব জীবনের অনেক ক্ষতি হয়। ছোট-খাট বিষয়ে যেসব কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে তাতে আপাতদৃষ্টিতে কোন ক্ষতি প্রত্যক্ষ করা না গেলেও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আছে মানব জীবনে।
 
কুসংস্কারের প্রভাবে মনে যে সংকীর্ণতা দেখা দেয় তা প্রতিফলিত হয় তার আচরণে, তার কাজে কর্মে। ফলে অতীতমুখিতা, অন্ধ বিশ্বাস, বিনা কারণে আতঙ্ক ইত্যাদি জীবনের গতিশীলতায় বাধা আনে এবং জীবনের সুষ্ঠু বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি হয়।
 
কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তি মুক্ত বুদ্ধি ও মুক্ত চিন্তার অধিকারী হয় না। তার মন আটকে থাকে পুরানো সংস্কারের মধ্যে। ফলে জীবনের সাধনা বাধাগ্রস্ত হয় এবং সমাজ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। ইংরেজি শিক্ষা ও নারী শিক্ষা সম্পর্কিত কুসংস্কার জাতির জন্য ভয়ানকভাবে ক্ষতি সাধন করেছে। সমাজে আভিজাত্যবোধ সমাজকে পঙ্গু করে রেখেছে।
 
বর্তমান অবস্থা : বর্তমানে কুসংস্কার সম্পর্কিত সমস্যার অনেক লাঘব ঘটেছে। এ যুগে শিক্ষার সম্প্রসারণ হয়েছে, নাগরিক জীবনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে। রেডিও, টেলিভিশনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জনগণ বিভিন্ন কার্যকলাপ সম্পর্কে জানতে পারছে। নিজেদের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে ধারণা হচ্ছে।
ফলে কুসংস্কারের প্রভাব অনেকাংশে কমেছে। তাছাড়া মানুষের জীবন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে; অর্থনৈতিক সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জটিল সমস্যাময় জীবনে পুরানো সব কুসংস্কার আঁকড়ে বসে থাকলে জীবনের সার্থকতা আশা করা চলে না। জীবনের প্রয়োজন যেখানে বেশি সেখানে কুসংস্কারের গুরুত্ব বেশি বলে মনে হবে না।
 
কুসংস্কার দূর করার উপায় : হাদিস শরীফে বলা হয়েছে, ‘টিকটিকির ডাক, কাকের বা অন্য কোন প্রাণীর ডাকের মধ্যে কোন শুভ বা অশুভ বলে কিছু নেই।’ কুসংস্কার ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের জন্য খুব ক্ষতিকর। কুসংস্কার যেমন ব্যক্তি জীবনের উন্নতির বাধা তেমনি জাতীয় জীবন থেকে কুসংস্কার দূর করতে হবে। শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলে কুসংস্কার দুর হতে পারবে। শিক্ষার আলোকে মনের সংকীর্ণতা দূর হয়, মন উদার হয়। শিক্ষার আলোকে আলোকিত হলে মন থেকে কুসংস্কার দূর হয়ে যাবে।
 
পত্র-পত্রিকায় কুসংস্কারমূলক কোন কিছু প্রচার করা যাবে না। সমাজ যাতে কুসংস্কারের ঘোর থেকে মুক্ত হতে পারে সেজন্য প্রচারণা চালানো যায়। মুক্ত বুদ্ধির চর্চা কুসংস্কার থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্যতম উপায়। মানুষের আর্থিক সচ্ছলতা দূরীভূত হলে এ সমস্যা কমবে। কুসংস্কারের অপকারিতা সম্পর্কে বইপত্রে আলোচনা থাকতে হবে। আলোচনা প্রচারণা কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনের অন্ধকার দূরে করে। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রচারণা করা আবশ্যক। ধর্মীয় কুসংস্কার দূর করার জন্য জনগণের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞানের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ধর্মের সত্য ও ন্যায়কে জীবনে প্রতিফলিত করতে হবে। ধর্মের ব্যাখ্যা তুলে ধরতে হবে। তাহলেই মানুষ কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনমানসিকতা থেকে অব্যাহতি লাভ করবে।
 
উপসংহার : মানব জীবন প্রতিনিয়ত গতিশীলতার পরিচয় দেয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের তাল মিলিয়ে চলতে হয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গেও সঙ্গতি রাখা দরকার। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে কুসংস্কারমুক্ত জীবনেই আধুনিকতার উজ্জীবন সম্ভব। মানব জীবনকে সফল ও সার্থক করে তোলার জন্য মুক্ত মানসিকতাসম্পন্ন শিক্ষিত বিজ্ঞানমনস্ক জনতার প্রয়োজন। তাই শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করে কুসংস্কারের অস্তিত্বকে বিলুপ্ত করতে হবে এবং সংস্কারমুক্ত চিত্তে বলতে হবে:
 
মঙ্গল প্রভাতে,
মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে,
উদার আলোক মাঝে, উন্মুক্ত বাতাসে।
Pesquisar
Categorias
Leia Mais
Paragraph and composition
গ্রামীণ ঐতিহ্য গ্রাম্য মেলা - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
গ্রামের মেলা / গ্রামীণজীবনে মেলার গুরুত্ব ভূমিকা : ‘মিলনের মধ্যে যে সত্য তা কেবল বিজ্ঞান...
Por শিক্ষা গুরু 2025-08-06 16:02:01 0 350
Paragraph and composition
দুর্গাপূজা - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
সূচনা : হিন্দু সম্প্রদায়ের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এ পূজা হিন্দুরা ধর্মীয় আচার ও নিয়ম...
Por শিক্ষা গুরু 2025-08-07 07:33:38 0 295
Paragraph and composition
স্যার জগদীশচন্দ্র বসু - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : বাঙালি বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু অন্যতম। তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাধনা...
Por শিক্ষা গুরু 2025-07-10 14:06:47 0 636
Photography
The beauty of the forest | Janie Fitness Photo Gallery
The beauty of the forest | Janie Fitness Photo Gallery       The beauty of the...
Por Janie Fit 2025-07-16 14:56:25 0 854
Paragraph and composition
চন্দ্রবিজয় - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : চন্দ্র বিজয় মানব সভ্যতার অন্যতম ঐতিহাসিক ঘটনা। চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ।...
Por শিক্ষা গুরু 2025-07-13 15:52:38 0 499
Otvut https://new.socitime.com/