বাংলাদেশের ফুল - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
Posté 2025-08-07 14:15:07
0
325
ভূমিকা : ফুল সৌন্দর্যের প্রতীক। ফুল ভালবাসেনা এমন ব্যক্তি হয় অন্ধ না হয় হৃদয়হীন। অনুকুল ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর সুবাদে বাংলাদেশ একটি উদ্ভিদসমৃদ্ধ অঞ্চল। অধিকন্তু হিমালয়, বর্ষা-মালয় ও পূর্ব-ভারতে উদ্ভিদজগতের মিলনস্থল বিধায় এখানে প্রজাতির সংখ্যা ও বৈচিত্র্য অধিক। যুগ যুগ ধরে এমন সমৃদ্ধ প্রকৃতির মাঝখানে বসবাসরত বাংলার মানুষ স্বভাবতই উদ্ভিদঘনিষ্ট ও পুষ্পপ্রেমিক, আর সেই সাক্ষ্য আছে বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের কাব্য, লোকগাথা ও লোকগীতিতে, এমনকি তাম্রলিপিতেও। এখানে বিচিত্র রকম ফুলের সৃষ্টি, রূপে গন্ধে সবার মন ভুলায়। তাই কবি ফুলের গন্ধে আকুল হয়ে বলেছেন-
“ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই।”
সহজলভ্যতা : বাংলাদেশের বনে-জঙ্গলে রয়েছে জানা-অজানা অসংখ্য ফুল। এ দেশে ফুলের প্রাচুর্য যেমন রয়েছে, তেমনি এখানে জনসাধারণের সযত্ন প্রচেষ্টায় জন্মে নানা প্রকারের ফুল। তাছাড়া সরকারের উদ্যান উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে উন্নত জাতের ফুলের বীজ ও চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা রয়েছে। আবার আমাদের পাহাড় ও বনাঞ্চলে অনেক প্রজাতির ফুল আছে যেগুলো বাগানে লাগানো যায়।
প্রয়োজনীয়তা : বাংলাদেশের ফুল এ দেশের মানুষের নির্মল আনন্দের খোড়াক, সুখ-শান্তির অনাবিল উৎস। ফুলের হাসিকে শিশুর হাসির সাথে তুলন করা হয়। পুষ্প মনোলোভা ও সৌন্দর্যের প্রতীক বলে- বিনোদনে, প্রয়োজনীয় উৎসব অনুষ্ঠানে, পূজা-পার্বণে অপরিহার্য হয়ে ওঠে, ওষুধ প্রস্তুতিতেও ফুল সাহায্যকারী। ফুল বাঙালি জীবনে আনন্দ ও উৎসবে, সৌন্দর্য ও সাধনায়- সর্বত্র অতি প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করে থাকে।
ফুলের প্রকারভেদ : ফুলকে নানাদিক থেকে শ্রেণীবিভাগ করা যায়। যেমন- ১। বাগানের ফুল, ২। বনের ফুল। আবার ঋতুর উপর নির্ভর করেও ফুলকে শ্রেণীবিভাগ করা যায়। নিচে ক্রমপর্যায়ে এদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হল।
বাগানের ফুল : এদেশের বাগানের গাছপালার সিংহভাগই বিদেশী। এগুলো এনেছেন রাজা-বাদশা, পরিভ্রাজক, বণিক, ঔপনিবেশিক শাসক ও তাদের কর্মচারীরা। বাংলাদেশের বাগানের ফুলগুলির মধ্যে ভারত, মায়ানমার ও মালয় ছাড়া আছে চীন, জাপান, আফ্রিকা ও ক্রান্তিয় আমেরিকার বহু প্রজাতি। পরিচিতির সুবিধার্থে এগুলোকে বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, কন্দীয়-মূলীয় ও মৌসুমি ফুল হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়।
পুষ্পবৃক্ষ : পুষ্পবৃক্ষ সাধারণত লাগানো হয় পার্কে, বড় বাগান, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যালয়ের চত্বরে। সুশ্রী পাতা, রঙিন প্রস্ফুটন ও মধুর গন্ধের জন্য এগুলো আকর্ষণীয়। উল্লেখযোগ্য পুষ্পবৃক্ষ হল- ছাতিম, কদম, রক্তকাঞ্চন, শিমুল, পলাশ, বটলব্রাস, কৃষ্ণচূড়া, জারুল, নাগেশ্বর, স্বর্ণচাপা, বকুল, শেফালী, অশোক ইত্যাদি।
গুল্ম ফুল : এগুলো গোড়া থেকে শাখায়িত, সাধারণত চিরসবুজ ও বহুবর্ষজীবী, ছোট-বড় সবধরনের বাগানেই লাগানো হয়। বাগান সজ্জার এই প্রধান উপকরণগুলোর মধ্যে আছে : ঘণ্টাফুল, রাধাচূড়া, ধুতরা, গন্ধরাজ, জবা, স্থলপদ্ম, রঙ্গন, বেলী, জবা, কামিনী, রক্তকরবী, টগর, নয়নতারা, গোলাপ ইত্যাদি।
লতা ফুল : এগুলোর অধিকাংশই বহুবর্ষজীবী, কাণ্ড দুর্বল বিধায় নিজেই কিংবা আঁকশি, কাঁটা ইত্যাদি উপাঙ্গের সাহায্যে আশ্রয় জড়িয়ে উপরে ওঠে। এগুলো মাটিতে তেমন জায়গা দখল করে না বলে ছোট বাগানেও বেশি সংখ্যায় লাগানো যায়। দালান, ফটক, বেড়া ইত্যাদিতে লতা বহুল ব্যবহৃত হয়। এগুলোর অনেক প্রজাতি রঙিন ফুল ও অন্যগুলো সুগন্ধি প্রস্ফুটনের জন্য আকর্ষণীয়। লতানো গোলাপ ও বাগানবিলাসের জন্য এ ফুলগুলোর বিশেষ সমাদর রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল : মালতী লতা, কাঁঠালী চাঁপা, বাগানবিলাস, অপরাজিতা, ভাদ্রা, চন্দ্রমুখী, দুধিয়া লতা, চামেলী, জুঁই, যূথিকা, ঝুমকা লতা, নীলমণি লতা, গোল্ডেন শাওয়ার, কুঞ্জলতা, মধুমালতী ইত্যাদি।
কন্দীয়-মূলীয় ফুল : এগুলো সাধারণত শীতের শুরুতেই চাষ করা হয়, কোন কোনটি বর্ষায়ও। শীতের বিবর্ণ প্রকৃতিতে নানা রঙ ছড়ায় বলে এগুলোর বিশেষ সমাদর রয়েছে। এরা অধিকাংশই বিদেশী জাতের। এগুলোর মধ্যে আছে : মোরগ ফুল, অ্যাস্টর, কসমস, হালিয়া, পিংক, কার্নেসন, সূর্যমুখী, স্ট্র ফ্লাওয়ার, পপি, গাঁদা, জিনিয়া ইত্যাদি।
ষড়ঋতুর অনন্য বৈচিত্র্যময় এই দেশ। বিভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতি এখানে নতুন নতুন উপহারে ফুলের ডালি সাজিয়ে আমাদের দ্বারে এসে উপস্থিত হয়। ফলে বছরের বিভিন্ন মৌসুমে নানা ধরনের ফুল দেখা যায়। বছরের ভিন্ন ভিন্ন ঋতুতে এদের আধিক্য লক্ষ করা যায় বলে এগুলো মৌসুমী ফুল হিসেবে চিহ্নিত হয়। যেমন:
গ্রীষ্মের ফুল : গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কিন্তু গাছে গাছে দেখা যায় রকমারী ফুলের বাহার। বেলী পলাশ, বকুল, কৃষ্ণচুড়া, চাপা, গন্ধরাজ ইত্যাদি ফুলের গন্ধে প্রকৃতির চারদিক মেতে ওঠে।
বর্ষার ফুল : স্রীষ্মের পরে আসে বর্ষা, আর তার সাথেই শুরু হয়ে যায় অবিরাম বৃষ্টিপাত। বনভূমি পায় নতুন জীবনের ছোঁয়া। তখন নানাধরনের ফুল ফুটে। যেমন- কদম, জুঁই, শাপলা, কেয়া মালতী, করবী ইত্যাদি ফুলের গন্ধে চারদিক সুবাসিত করে।
শরতের ফুল : শরৎ আসে শান্ত-স্নিগ্ধ ও মধুর পরিবেশে। সবুজ ধান গাছে মাঠ ভরে যায়- সবখানে বিরাজ করে সজীবতা ও সবুজের সমারোহ। পদ্ম, কাশ আর কামিনীর হাসিতে প্রকৃতি হাসতে থাকে।
হেমন্তের ফল : শরৎ শেষে আসে হেমন্ত। প্রাচুর্য, সুখ ও সোনালি ফসলের ভরা ঢালি নিয়ে। আকাশে সাদা সাদা হালকা মেঘ ভেসে বেড়ায়। শেফালী, শাপলা, চাঁপা আর পারুলের সুবাসে ও সৌন্দর্যে আমাদের নয়ন ও মন মুদ্ধ হয়।
শীতের ফুল : শীতের সময় গাছের পাতা ঝরে যায়। প্রকৃতিকে দেখে মনে হয় যেন শীতের কাফন জড়ানো। এ সময় গোলাপ, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, সূর্যমুখী, গাদা এবং বকুল ফুলের গন্ধে মনকে আকুল করে।
বসন্তের ফুল : প্রকৃতিকে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলার আমন্ত্রণ জানায় বসন্তের ফুল। ঋতুরাজ বসন্ত আসে ফুল সাজ পরে তাই তাকে বলা হয় মধু ঋতু। শিমুল, পলাশ, মাধবী, অশোক প্রভৃতি ফুলের সৌন্দর্য মনে দোলা দেয়। এ জন্যই কবি বলেছেন-
“আজি এ বসন্তে কত ফুল ফোটে”
বনফুল : বনফুল হল চাষ বা যত্ন ছাড়া বেড়ে ওঠা সপুষ্পক উদ্ভিদ। বিপুল সংখ্যক বুনো উদ্ভিদ পৃথিবীর পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং প্রয়োজনীয় অক্সিজেন যোগায়। বনফুলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল : ছোট মোরগফুল, ঢোলপাতা, ঝুরঝুরি, কাশ, শেয়ালকাঁটা, সর্পগন্ধা, আকন্দ, পিতরাজ, কদম, বেত, সাদা-কলমি, পাহাড়ি কাশ, বনকলা, হলদে ফুল, ঘাসফুল বনআদা, হেলেঞ্চা, হিজল, চাঁদমালা, রক্তকমল ইত্যাদি।
মানুষের বন্ধু : ফুল আমাদের প্রকৃতির দান ও সৌন্দর্যের প্রতীক। মানুষের সুখে-দুঃখে, হর্ষে-বিষাদে, পূজা-পার্বণে, প্রেমে ও ভক্তিতে, রোগে-শোকে বন্ধুর মত কাজ করে। কবিতার ভাষায়-
“আমাদেরি কুটির কাননে
ফুটে পুষ্প, কেহ দেয় দেবতা-চরণে
কেহ রাখে প্রিয়জন তরে- তাহে তাঁর
নাহি অসন্তোষ।”
উপসংহার : এ দেশ ফুলের দেশ। বাংলার ফুল যুগে যুগে বিদেশীদেরও আকৃষ্ট করেছে। বাংলাদেশের জলবায়ু, আবহাওয়া ও মাটি নানারকম ফুল উৎপাদনে উপযোগী। এদেশে এখন প্রচুর পরিমাণে ফুলের চাষ হয়। সারা বছর ফুল পাওয়া যায়- বিশেষ করে রজনীগন্ধা ও নানাজাতের গোলাপ। ফুল চাষ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বেশ লাভজনক।
Rechercher
Catégories
- News
- Éducation
- Homework
- Entertainment
- Nature
- Tips and tricks
- Science and Technology
- Foodstuff
- Health & Beauty
- Autre
Lire la suite
আদিবাসী জনগোষ্ঠী / আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : সমগ্র বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। বাংলাদেশেও এমনি ছোট-বড়...
How to increase Wi-Fi speed
Technology has become an integral part of our daily lives and it is influencing almost every...
বাক্য প্রকরণ (আকাঙ্ক্ষা, আসক্তি, যোগ্যতা) - বাংলা ব্যাকরণ
বাক্য প্রকরণ
ভাষার মূল উপকরণ হলো অর্থবোধক বাক্য এবং বাক্যের মৌলিক উপাদান হলো শব্দ।
বাক্য কাকে...
গণতন্ত্র - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : গণতন্ত্র হল সমাজ দর্শন ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের একটি সুপরিচিত ধারণা- যার অর্থ জনগণের...
বাংলা সাহিত্য / বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস - বাংলা প্রবন্ধ রচনা
ভূমিকা : বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এ বাংলা ভাষাতেই গড়ে উঠেছে হাজার বছরেরও পুরনো বাংলা সাহিত্য।...